Jahirul Hasan
প্রকাশ : Sep 3, 2026 ইং
অনলাইন সংস্করণ

হরমুজ প্রণালিতে অস্থিরতার জেরে তেল-গ্যাস মজুতের পরিকল্পনায় এশিয়া

টানা ছয় মাস ধরে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আগ্রাসনের জেরে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা অব্যাহত রয়েছে। এ সময় জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম গুরত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে সীমিত হয়ে আসে। এতে এশিয়া দেশগুলোর ভয়াবহ অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মুখে পড়তে হয়।

তেল ও গ্যাসের দাম বেড়ে যাওয়ায় এশীয় দেশগুলো দ্রুত জ্বালানি সাশ্রয়ের নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করে। এমন পরিস্থিতিতে দামের ঊর্ধ্বসীমা নির্ধারণ, গাড়ির চলাচলের জন্য নির্দিষ্ট দিন ভাগ করে দেওয়া এবং সরকারি কর্মীদের জন্য বাড়ি থেকে কাজ করার (ওয়ার্ক-ফ্রম-হোম) পরিকল্পনা হাতে নেয়।

এশিয়া ইতিহাসের সবচেয়ে বড় এই জ্বালানি সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার ঘটনার একটি স্থায়ী সমাধানের পথ খুঁজতে শুরু করেছে। যার মূল লক্ষ্য হলো প্রয়োজনীয় তেল ও গ্যাস নিজেদের অঞ্চলের কাছাকাছি কোথাও মজুদ রাখা। অক্সফোর্ড ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি স্টাডিজ-এর ভিজিটিং রিসার্চ ফেলো পারুল বকশি বলেন, এই সংকট দুই ধরনের ভিন্ন বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করছে। এক এমন অবকাঠামো যা ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকি এড়িয়ে চলে এবং দুই এমন অবকাঠামো যা আমদানিকৃত জ্বালানির ওপর নির্ভরতা পুরোপুরি দূর করে।

এই সংকট থেকে উদ্ভূত সবচেয়ে উচ্চাকাঙ্ক্ষী প্রস্তাবগুলোর একটি এসেছে জাপানের কাছ থেকে। মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল হওয়া সত্ত্বেও দেশটি অন্যান্য অনেক দেশের তুলনায় এই সংকটটি ভালোভাবেই সামাল দিয়েছে। কারণ তাদের রয়েছে বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম কৌশলগত তেল মজুদ।

টোকিও চায় দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রতিবেশী দেশগুলোও তাদের এই পথ অনুসরণ করুক। গত এপ্রিলে জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি ১০ বিলিয়ন ডলারের ‘পাওয়ার এশিয়া’ উদ্যোগের ঘোষণা দেন। এই উদ্যোগের লক্ষ্য হলো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোকে তেল ও পেট্রোলিয়াম পণ্য সংগ্রহে সহায়তা করা এবং দীর্ঘমেয়াদে কৌশলগত মজুদ গড়ে তুলতে সাহায্য করা।

সরকারি সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে ইরান-কেন্দ্রিক সংঘাত শুরুর সময় ভিয়েতনামের জাতীয় মজুত ভাণ্ডারে মাত্র ৫ থেকে ৭ দিনের চাহিদা মেটানোর মতো তেল ছিল। তবে বাণিজ্যিক মজুত ও অন্যান্য উৎসের সরবরাহ বিবেচনায় নিলে এই সময়সীমা আরও ৬৫ দিন পর্যন্ত বাড়তে পারত।

মার্চের শুরুর দিকে থাইল্যান্ডের সরকারি ও বেসরকারি খাত মিলিয়ে প্রায় ৬১ দিনের মজুত ছিল। যেখানে তাদের জন্য ন্যূনতম ২৫ দিনের মজুত রাখা বাধ্যতামূলক এবং ফিলিপাইনের বেসরকারি বাণিজ্যিক মজুতে ৫০ থেকে ৬০ দিনের সরবরাহ ছিল বলে ধারণা করা হয়। এই সবকটি পরিসংখ্যানই ছিল ‘ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সি’ (আইইএ)-র নির্ধারিত ৯০ দিনের ন্যূনতম মানদণ্ডের চেয়ে কম।

ব্যাংকক ও ম্যানিলায় এই যুদ্ধের ফলে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন একটি পূর্ণাঙ্গ কৌশলগত তেল মজুত ব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ নতুন করে গতি পেয়েছে। গত মাসে ফিলিপাইনের একটি সংসদীয় কমিটি ৬০ দিনের সরকারি মজুত গড়ে তোলার লক্ষ্যে একটি বিল অনুমোদন করেছে। ব্যাংকক ভিত্তিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ‘ম্যাভেরিক কনসাল্টিং গ্রুপ’-এর বেন কিয়াতকোয়ানকুল জানান, থাই কর্মকর্তারা উপদ্বীপজুড়ে অপরিশোধিত তেলের নতুন পাইপলাইন ও বিশাল সংরক্ষণাগার (ট্যাংক ফার্ম) তৈরির পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন। এর মাধ্যমে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের অপরিশোধিত তেল সংরক্ষণের ক্ষেত্রে সিঙ্গাপুরের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে নিজেদের অবস্থান তৈরি করতে চাইছে থাইল্যান্ড।

দক্ষিণ এশিয়ায় এই যুদ্ধের ফলে ভারতও তার কৌশলগত তেল মজুত ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে চিন্তাভাবনা শুরু করেছে। ‘এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল’-এর তথ্য অনুযায়ী, মে মাস পর্যন্ত ভারতের কাছে প্রায় ৭৪ দিনের তেল মজুত ছিল এবং এর ৯০ শতাংশেরও বেশি ছিল রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

জুলাই মাসে ভারতের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ‘অয়েল অ্যান্ড ন্যাচারাল গ্যাস কর্পোরেশন’ (ওএনজিসি) ঘোষণা দেয়, তারা দেশের দক্ষিণাঞ্চলে ১৭.৫ লাখ মেট্রিক টন (বা ১ কোটি ৩০ লাখ ব্যারেল) ধারণক্ষমতার একটি মজুতাগার গড়ে তুলবে; এর পাশাপাশি বিদ্যমান মজুত ভাণ্ডার আরও ৬৫ লাখ মেট্রিক টন বাড়ানোর পরিকল্পনাও তাদের রয়েছে।

এদিকে, এশিয়ার বৃহত্তম অর্থনীতির দেশগুলো পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের সরবরাহকারীদের সাথে সরাসরি তেল সংরক্ষণের চুক্তি করার বিষয়টি খতিয়ে দেখছে। কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস-এর জলবায়ু ও জ্বালানি বিষয়ক জ্যেষ্ঠ ফেলো ক্লারা গিলিসপি বলেন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং সিঙ্গাপুরের সাথে মধ্যপ্রাচ্যের বেশ কয়েকটি দেশের দীর্ঘদিনের সম্পর্ক ও অংশীদারিত্ব রয়েছে, যার লক্ষ্য হলো নিজেদের উপকূলের কাছাকাছি এলাকায় জ্বালানি মজুত গড়ে তোলা।

গিলিসপি আরও বলেন, এই তিনটি দেশের ক্ষেত্রেই বিদ্যমান মজুত সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি নতুন কোনো সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষরের বিষয়ে আগ্রহের কথা শোনা গেছে। ভারতের সাথেও সম্পর্ক সম্প্রসারণের বিষয়ে আলোচনা চলছে। নয়াদিল্লিভিত্তিক জননীতি বিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশন’-এর তথ্য অনুযায়ী, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং তাদের প্রতিষ্ঠান ‘আবুধাবি ন্যাশনাল অয়েল কোম্পানি’ ইতোমধ্যেই সিঙ্গাপুর, ভারত, দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানে তেল মজুত করে রেখেছে; পাশাপাশি কুয়েত ও সৌদি আরবও দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানে তাদের মজুত গড়ে তুলেছে।

অ্যাডনক ভারতে তাদের অপরিশোধিত তেলের মজুত সক্ষমতা বাড়িয়ে ৩ কোটি (৩০ মিলিয়ন) ব্যারেলে উন্নীত করার লক্ষ্য নিয়েছে। অন্যদিকে ভারত সরকার হরমুজ প্রণালির মতো ঝুঁকিপূর্ণ ও সংকীর্ণ পথের বাইরে অর্থাৎ ওমান উপসাগরের তীরে অবস্থিত সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরাহ বন্দরে তাদের কৌশলগত মজুতের একটি অংশ রাখার প্রস্তাব বিবেচনা করছে।

দক্ষিণ কোরিয়ার গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, সিউল তাদের প্রায় ১৪ কোটি ৬০ লাখ (১৪৬ মিলিয়ন) ব্যারেল তেলের মজুত আরও ৩ থেকে ৪ কোটি (৩০-৪০ মিলিয়ন) ব্যারেল বাড়ানোর বিষয়টি বিবেচনা করছে। অথচ শুরুতে তাদের অতিরিক্ত ২ কোটি (২০ মিলিয়ন) ব্যারেল মজুত করার পরিকল্পনা ছিল। হংকংভিত্তিক ‘লানতাউ গ্রুপ’-এর চীনা জ্বালানি নীতি বিষয়ক বিশেষজ্ঞ ডেভিড ফিশম্যান বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের পর বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম তেল ব্যবহারকারী দেশ চীনে হরমুজ প্রণালি অবরুদ্ধ হওয়ার ঘটনাটি এই বিশ্বাসকে আরও জোরালো করেছে, দেশটির জ্বালানি নিরাপত্তায় অবশ্যই বিনিয়োগ করা প্রয়োজন।

তেল ও গ্যাস খাতের উন্নয়নে বেইজিংয়ের সর্বশেষ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় (যা ২০২৬ থেকে ২০৩০ সাল পর্যন্ত নীতি নির্ধারণ করবে) গভীর সমুদ্রে খনন কার্যক্রম বাড়ানোর পাশাপাশি আরও পাইপলাইন স্থাপন এবং এলএনজি মজুত সক্ষমতা বৃদ্ধির মতো পদক্ষেপগুলো অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন পাইপলাইন পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান 'পাইপচায়না' মে মাসে জানিয়েছিল, তারা তাদের প্রায় ৪০টি তেল ও গ্যাস প্রকল্পের মধ্যে ৯,০০০ কিলোমিটার (৫,৫৯০ মাইল) অভ্যন্তরীণ পাইপলাইনও অন্তর্ভুক্ত নির্মাণকাজ ত্বরান্বিত করছে।

যদিও এই পরিকল্পনাগুলোর খসড়া ইরান-সংঘাত শুরুর আগেই তৈরি করা হয়েছিল। তবে ফিশম্যানের মতে, এই সংঘাত এ ধরনের বিনিয়োগের যৌক্তিকতাকে আরও জোরালো করেছে। ফিশম্যান বলেন, "পঞ্চদশ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার খসড়ায় এই বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করার পেছনে হরমুজ প্রণালি ঘটনা সরাসরি কোনো কারণ না হলেও, এটি নীতিনির্ধারকদের কাছে নিশ্চিতভাবে প্রমাণ করেছে তাদের চিন্তাধারা সঠিক এবং দীর্ঘস্থায়ী অস্থিতিশীলতা নিয়ে তাদের ধারণাগুলোও যথার্থ ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত।

তিনি আরও বলেন, জাতীয় পর্যায়ে জ্বালানির অতিরিক্ত বা বাড়তি মজুদ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে খরচ বা শ্রম নিয়ে অভ্যন্তরীণভাবে যে সংশয় বা অনিশ্চয়তা ছিল, তা নিশ্চিতভাবেই এখন আর নেই। অক্সফোর্ডের বকশি বলেন, পুরো অঞ্চলজুড়ে একটি সাধারণ বিষয় বা লক্ষ্য হলো কোনো একটি নির্দিষ্ট জ্বালানি উৎস, সরবরাহকারী বা গুরুত্বপূর্ণ সংকীর্ণ পথ বা চোকপয়েন্ট-এর ওপর অতি-নির্ভরতা কমিয়ে আনা।

বকশি বলেন, জ্বালানির পরবর্তী চালান বা ব্যারেলটি কোথা থেকে আসবে কেবলমাত্র সেই প্রশ্নটিই এখন আর যথেষ্ট নয়। আমাদের আরও প্রশ্ন করতে হবে, জ্বালানিটি কীভাবে গন্তব্যে পৌঁছাবে, এটি ছাড়া আমরা কতদিন কার্যক্রম চালিয়ে যেতে পারব এবং সেই জ্বালানির প্রয়োজনীয়তা আমরা পুরোপুরি কমিয়ে আনতে পারব কি না।

সূত্র: আলজাজিরা।

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

বেরোবিতে র‌্যাগিং প্রতিরোধে শিক্ষার্থীদের সাথে মতবিনিময় সভা

1

‘গুলশানের চামেলি’ হবেন কলকাতার ‘পাখি’

2

থাইল্যান্ডে শুটিং করতে গিয়ে আহত খায়রুল বাসার

3

রাতের মধ্যে সাত অঞ্চলে ঝড়ের সতর্কতা

4

ট্রাম্পের কোরিয়া চালেই বদলে যাচ্ছে পূর্ব এশিয়ার শক্তির সমীকর

5

আমরা যেন জুলাইকে হারিয়ে না ফেলি : রাষ্ট্রপতি

6

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক সুদৃঢ় করতে ‘ফ্রেশ স্টার্ট’ জরুরি: স্বর

7

গণতন্ত্র শক্তিশালীকরণ ও অর্থনৈতিক পুনর্গঠনে কাজ করছে সরকার :

8

টানা তৃতীয় পেনাল্টি মিস মেসির, মিয়ামির বড় হার

9

নতুন রূপ ও গল্পে আসছে শাকিবের ‘অপারেশন অগ্নিপথ’

10

পূর্বঘোষণা ছাড়াই ভেদরগঞ্জ হাসপাতাল পরিদর্শন করলেন স্বাস্থ্য

11

আফ্রিকার দেশ বেনিনে যাচ্ছেন সাফ প্রেসিডেন্ট খিয়াং নয়ন

12

রাফিনিয়াকে প্রশংসায় ভাসালেন হান্সি ফ্লিক

13

মশা নিধনে দেশীয় উদ্ভাবন পরীক্ষামূলক প্রয়োগে মির্জা ফখরুলের আ

14

বাড়িতে হামলা, মামলা, অ্যাকাউন্ট জব্দ, দেশে ফেরা নিয়ে যা বললে

15

প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফর এখনো চূড়ান্ত হয়নি : পররাষ্ট্র প্রতি

16

২০৩৪ সালের মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়তে আমরা দৃঢ়প্রতি

17

জার্মানির কাছ থেকে ৬টি সাবমেরিন কিনছে ভারত, বাজেট ৭০ হাজার ক

18

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে ফোনালাপ নিয়ে ফেসবুকে যা বল

19

ইংল্যান্ডকে টপকে র‌্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষে ফিরল ভারত

20