মাত্র ৩৩ দিনে প্রায় দুই কেজি ওজনের হয়ে ওঠে এক জাতের মুরগি। দ্রুত মাংস উৎপাদনের জন্য জনপ্রিয় এ মুরগি পালন নিয়েই এবার প্রশ্ন উঠেছে ইউরোপে। গোপনে ধারণ করা ভিডিওতে খামারে মুরগি পালনের অনিয়মের অভিযোগ সামনে আসার পর দ্রুত বর্ধনশীল ‘টার্বো চিকেন’ নিষিদ্ধ করার উদ্যোগ নিয়েছে ডেনমার্ক। দেশটিতে নিষেধাজ্ঞা কার্যকরের পাশাপাশি ইউরোপীয় ইউনিয়নজুড়েও এ জাতের মুরগি নিষিদ্ধ করার আহ্বান জানিয়েছে সরকার।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান মঙ্গলবার এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ডেনমার্কের একটি বড় মুরগি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের খামারে প্রাণী কল্যাণ আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ ঘিরে দেশটিতে ব্যাপক ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। টিভি২ টেলিভিশনের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে গোপনে ধারণ করা ভিডিও প্রকাশের পর বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে। ভিডিওতে দেখা যায়, খামারে মুরগিকে প্রতিদিন আইন অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ের অর্ধেক সময় অন্ধকারে রাখা হচ্ছিল। অভিযোগ, মুরগির খাওয়ার সময় বাড়িয়ে দ্রুত ওজন বৃদ্ধি নিশ্চিত করতেই এ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। ডেনমার্কের আইন অনুযায়ী, মুরগিকে প্রতিদিন অন্তত ছয় ঘণ্টা অন্ধকারে রাখার কথা। কিন্তু সংশ্লিষ্ট খামারে তাদের মাত্র তিন ঘণ্টা অন্ধকারে রাখা হচ্ছিল বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
৩৩ দিনেই দুই কেজি
ডেনমার্কে বহুল ব্যবহৃত দ্রুত বর্ধনশীল মুরগির জাতটির নাম ‘রস ৩০৮’। দ্রুত ওজন বাড়ার কারণে একে ‘টার্বো চিকেন’ বলা হয়। এ জাতের মুরগির বাচ্চার ওজন প্রায় ৫০ গ্রাম থেকে মাত্র ৩৩ দিনে বেড়ে প্রায় দুই কেজি হয়। অন্যদিকে, তুলনামূলক ধীরে বেড়ে ওঠা জাতগুলোর একই ওজনে পৌঁছাতে ৪৬ থেকে ৬৩ দিন সময় লাগে। প্রাণী কল্যাণ নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলোর দাবি, অস্বাভাবিক দ্রুত শারীরিক বৃদ্ধি মুরগির হাড় ও অভ্যন্তরীণ অঙ্গের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। অনেক ক্ষেত্রে মুরগির পা শরীরের অতিরিক্ত ওজন বহন করতে পারে না। ফলে হাঁটাচলায় অসুবিধা, পায়ের আঘাত এবং অন্যান্য শারীরিক সমস্যা দেখা দেয়। ইউরোগ্রুপ ফর অ্যানিম্যালসের হিসাবে, ইউরোপীয় ইউনিয়নে উৎপাদিত মুরগির প্রায় ৯৫ শতাংশই নিবিড় খামারব্যবস্থায় পালন করা হয়। এ ব্যবস্থায় কম সময়ে কম খরচে বেশি মাংস উৎপাদনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। প্রাণী অধিকারকর্মীদের অভিযোগ, উৎপাদন খরচ কমানোর প্রতিযোগিতায় মুরগির স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও সুস্থতার বিষয়টি যথেষ্ট গুরুত্ব পাচ্ছে না।
দেশজুড়ে নিষেধাজ্ঞার উদ্যোগ
ডেনমার্কের প্রকৃতি ও প্রাণী কল্যাণবিষয়ক মন্ত্রী ক্রিশ্চিয়ান রাবইয়র্গ ম্যাডসেন বলেছেন, দ্রুত বর্ধনশীল মুরগির জাতটির ওপর জাতীয় পর্যায়ে নিষেধাজ্ঞা আরোপের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তবে এ বিষয়ে আইনি ও অর্থনৈতিক দিকগুলো খতিয়ে দেখতে হবে। একই সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নজুড়ে নিষেধাজ্ঞা কার্যকরের জন্যও কাজ করবে ডেনমার্ক। গোপনে ধারণ করা ভিডিও প্রকাশের পর সংশ্লিষ্ট খামারমালিক ক্রিশ্চিয়ান টভারগার্ড কিছু ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা স্বীকার করেছেন। তিনি বলেছেন, খামারের আলো ব্যবস্থাপনা ও কাজের পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনা হয়েছে এবং নিয়মকানুন আরও কঠোর করা হয়েছে। দেশটির বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মধ্যে টার্বো চিকেন নিষিদ্ধ করার বিষয়ে সমর্থন তৈরি হয়েছে। প্রাণী কল্যাণ সংগঠনগুলোও উদ্যোগটিকে স্বাগত জানিয়েছে। তাদের মতে, দ্রুত বর্ধনশীল জাতের মুরগির পরিবর্তে এমন জাত ব্যবহার করা উচিত, যেগুলো স্বাভাবিকভাবে বেড়ে ওঠার জন্য বেশি সময় পায়। ডেনমার্কের একটি সংগঠন সব মুরগিকে জৈব পদ্ধতিতে পালিত মুরগির মতো প্রায় ৫৬ দিন ধরে বড় করার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।
আমদানি নিয়েও উদ্বেগ
তবে শুধু ডেনমার্কে মুরগির এ জাত পালন নিষিদ্ধ করলে কাঙ্ক্ষিত ফল নাও আসতে পারে বলে সতর্ক করেছেন শিল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তাঁদের আশঙ্কা, দেশে দ্রুত বর্ধনশীল মুরগি উৎপাদন বন্ধ হলেও বিদেশ থেকে একই জাতের মুরগির মাংস আমদানি অব্যাহত থাকলে প্রাণী কল্যাণের উন্নতি হবে না। বরং স্থানীয় উৎপাদক ও কর্মসংস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এ কারণে প্রাণী কল্যাণকর্মীরা ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারজুড়ে অভিন্ন নীতিমালা চালুর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন। তাদের মতে, উৎপাদনব্যবস্থায় পরিবর্তন আনতে হলে শুধু খামার পর্যায়ে নিষেধাজ্ঞা যথেষ্ট নয়; আমদানি করা মাংসের ক্ষেত্রেও একই ধরনের মানদণ্ড প্রয়োজন। ডেনমার্কে সাম্প্রতিক সময়ে প্রাণী কল্যাণ নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক জোরালো হয়েছে। এর আগে শূকর পালনের পদ্ধতি নিয়ে বিতর্ক দেশটির নির্বাচনী আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ জায়গা করে নেয়। এখন দ্রুত বর্ধনশীল মুরগির জাত নিষিদ্ধের উদ্যোগ দেশটির কৃষি উৎপাদন, খাদ্যবাজার ও প্রাণী কল্যাণনীতিতে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
তথ্য সূত্র- দ্য গার্ডিয়ান।