বিশ্ব কূটনীতির সর্বোচ্চ ও সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ক্ষেত্র হলো জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ। বিশ্বনেতাদের এই মহাঅধিবেশনে নিজ নিজ দেশের প্রতিনিধিত্ব করা যেকোনো রাষ্ট্রনায়কের জন্য অত্যন্ত গৌরব ও পরম সম্মানের বিষয়। জাতিসংঘের প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে সুদীর্ঘ ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, আন্তর্জাতিক রাজনীতির শীর্ষ মঞ্চে বিভিন্ন দেশের প্রভাবশালী রাজনৈতিক পরিবারের একাধিক সদস্যের পদচারণ ঘটেছে। কোথাও পিতা-পুত্র, পিতা-কন্যা, আবার কোথাও স্বামী-স্ত্রী রাষ্ট্র কিংবা সরকারপ্রধান হিসেবে নিজ দেশের অবস্থান ও দৃষ্টিভঙ্গি বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরেছেন।
তবে বিশ্ব রাজনীতির এই সুদীর্ঘ ইতিহাস গভীরভাবে অনুধাবন করলে একটি অত্যন্ত বিরল, অনবদ্য এবং অতুলনীয় সত্য দিবালোকের মতো স্পষ্ট হয়ে ওঠে। জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার পর থেকে আজ পর্যন্ত বিশ্বের কোনো রাজনৈতিক পরিবার যা অর্জন করতে পারেনি, ঠিক সেই অনন্য ও ঐতিহাসিক নজির গড়েছে বাংলাদেশের জিয়া পরিবার। একই পরিবারের পিতা, মাতা এবং সন্তান—তিনজনেরই রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান হিসেবে বিশ্বমঞ্চে নিজ দেশের প্রতিনিধিত্ব করার একক এবং বিশ্বজোড়া একমাত্র মেধার ও গৌরবের স্থানটি এখন জিয়া পরিবারের দখলে।
এই অভাবনীয় ও বিরল সাফল্য কেবল বাংলাদেশের রাজনীতিতেই এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেনি, বরং আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতিতেও জিয়া পরিবারকে এনে দিয়েছে এক অনন্য উচ্চতা ও আকাশচুম্বী গ্রহণযোগ্যতা। এই মহিমান্বিত আন্তর্জাতিক গৌরবগাথার মূল সূচনা হয়েছিল বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতার ঘোষক, বহুদলীয় রাজনীতির প্রবর্তক ও আধুনিক বাংলাদেশের কালজয়ী রূপকার শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের হাত ধরে। পরবর্তী সময়ে তাঁর ত্যাগী ও আপসহীন সহধর্মিনী, দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া এবং বর্তমানে তাঁদের যোগ্য উত্তরসূরি দেশনায়ক তারেক রহমান সেই দেশপ্রেম ও জাতীয় সার্বভৌমত্বের পতাকাকে বিশ্বমঞ্চে স্বমহিমায় ও আপন যোগ্যতায় প্রবাহমান রেখেছেন।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূল ভিত "সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারও সাথে বৈরিতা নয়"—এর সুদৃঢ় ও দূরদর্শী অবকাঠামো তৈরি করেছিলেন শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। ১৯৭৫ পরবর্তী এক চূড়ান্ত সংকটময় ও নাজুক পরিস্থিতিতে দেশ পরিচালনার গুরুদায়িত্ব গ্রহণ করে তিনি বাংলাদেশকে একটি তলাবিহীন ঝুড়ির অপবাদ থেকে টেনে তুলে এক আত্মমর্যাদাশীল ও স্বাবলম্বী জাতিতে পরিণত করেন। জাতিসংঘের অফিশিয়াল নথিপত্র পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ১৯৮০ সালের ২৬ আগস্ট সাধারণ পরিষদের একাদশ বিশেষ অধিবেশনে রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে বিশ্বমঞ্চে এক ঐতিহাসিক ভাষণ প্রদান করেন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান।
তিনি সেদিন কেবল বাংলাদেশের কণ্ঠস্বর হিসেবেই কথা বলেননি, বরং সমকালীন বৈশ্বিক অর্থনীতি, ওআইসি এবং মুসলিম বিশ্বের ভাবমূর্তি রক্ষা, আঞ্চলিক সহযোগিতার বিকাশ এবং তৃতীয় বিশ্বের অনগ্রসর ও উন্নয়নশীল রাষ্ট্রগুলোর অধিকার রক্ষায় এক স্পষ্ট দিকনির্দেশনামূলক রূপরেখা বিশ্বনেতাদের সামনে উপস্থাপন করেছিলেন। বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠা, অনুবর্তী জাতিগুলোর অর্থনৈতিক মুক্তি এবং জাতিসংঘ শান্তি রক্ষা মিশনে বাংলাদেশের সক্রিয় অংশগ্রহণের যে দূরদর্শী রুপরেখা তিনি সেদিন একেছিলেন, তা আজও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অত্যন্ত শ্রদ্ধার সাথে স্মরিত হয়। শহীদ জিয়ার ব্যক্তিত্ব, মেধা, প্রজ্ঞা এবং আন্তর্জাতিক বন্ধুত্বের প্রসারের ফলেই বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের অবস্থান এক অনন্য উচ্চতায় উন্নীত হয়।
প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের শাহাদাতের পর যখন বাংলাদেশের গণতন্ত্র ও স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব পুনরায় এক গভীর সংকটে নিপতিত হয়, ঠিক তখনই রাজপথে নেমে এসে জনগণের ভোটাধিকার পুনরুদ্ধারের আপসহীন সংগ্রামে নেতৃত্ব দেন বেগম খালেদা জিয়া। দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে রাষ্ট্রীয় দায়িত্বভার গ্রহণ করার পর তিনি কেবল অভ্যন্তরীণ রাজনীতির সুশাসন ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাই প্রতিষ্ঠা করেননি, বরং আন্তর্জাতিক কূটনীতিতেও এক অভূতপূর্ব সফলতার স্বাক্ষর রাখেন। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বেগম খালেদা জিয়া একাধিক সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের বলিষ্ঠ প্রতিনিধিত্ব করেন। বিশ্বমঞ্চে তাঁর প্রতিটী ভাষণেই বারবার প্রাধান্য পেয়েছে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব সুরক্ষা, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা, নারীর ক্ষমতায়ন, দারিদ্র্য বিমোচন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক সংকট। মধ্যপ্রাচ্য থেকে শুরু করে পাশ্চাত্যের পরাশক্তিগুলোর সাথে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন এক অত্যন্ত ভারসাম্যপূর্ণ, সুদৃঢ় ও মর্যাদাপূর্ণ কূটনৈতিক সম্পর্ক। বিশ্বনেতৃবৃন্দের কাছে বেগম খালেদা জিয়া পরিচিত হয়ে ওঠেন গণতন্ত্রের এক অকুতোভয় ও অপরাজেয় প্রতীক হিসেবে, যা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে জিয়া পরিবারের সুপরিচিতি ও গ্রহণযোগ্যতাকে বহু দূর এগিয়ে নিয়ে যায়।
শহীদ জিয়াউর রহমান এবং বেগম খালেদা জিয়ার সেই মহীয়সী রক্ত, দেশপ্রেম ও আদর্শ ধমনীতে ধারণ করে বৈশ্বিক রাজনীতির নতুন ক্যানভাসে আবির্ভূত হয়েছেন দেশনায়ক তারেক রহমান। দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে রাজনৈতিক আন্দোলন-সংগ্রাম, অগণিত জেল-জুলুম, ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি এবং দেশের কোটি কোটি মানুষের অকৃত্রিম ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে তিনি আজ বাংলাদেশের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে দেশের সরকারপ্রধান হিসেবে তাঁর বক্তব্য রাখতে যাওয়া কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং এটি এক ঐতিহাসিক অবধারিত পরিণতি। এর মধ্য দিয়ে পিতা ও মাতার পর একই পরিবারের তৃতীয় সদস্য হিসেবে জাতিসংঘের সর্বোচ্চ মঞ্চে বক্তব্য দেওয়ার এক নজিরবিহীন ঐতিহাসিক নজির স্থাপন করল জিয়া পরিবার। বিশ্ব রাজনীতির ইতিবৃত্তে এমন ট্রিপল ক্রাউন অর্জনের ঘটনা আর একটিও খুঁজে পাওয়া যায় না। দেশনায়ক তারেক রহমানের এই বিশ্বমঞ্চে পদার্পণ ও ভাষণ প্রদান প্রমাণ করে যে, জিয়া পরিবারের রাজনৈতিক ধারা কেবল বংশানুক্রমিক কোনো উত্তরাধিকার নয়, বরং তা জনগণের প্রতি অগাধ দায়বদ্ধতা, ত্যাগ এবং সম্পূর্ণ আপন যোগ্যতায় অর্জিত এক বৈশ্বিক স্বীকৃতি।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শীর্ষ রাজনৈতিক কাঠামোর দিকে নজর দিলে দেখা যায়, বেশ কিছু পরিবার বিশ্বমঞ্চে দীর্ঘ সময় নেতৃত্ব দিয়েছে। ভারতের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে আমরা দেখি নেহরু-গান্ধী পরিবারের তিন সদস্য জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে বক্তব্য রেখেছেন। ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু ১৯৪৮ ও ১৯৬০ সালে ভাষণ দেন, পরবর্তীতে তাঁর কন্যা ইন্দিরা গান্ধী ১৯৬৮ ও ১৯৮৫ সালে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে জাতিসংঘের মঞ্চে বক্তব্য রাখেন এবং ইন্দিরা গান্ধীর পুত্র রাজীব গান্ধীও প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ১৯৮৫ ও ১৯৮৮ সালে সাধারণ পরিষদে ভারতের প্রতিনিধিত্ব করেন। একইভাবে শ্রীলঙ্কার রাজনীতিতে এস ডব্লিউ আর ডি বন্দরনায়েক ১৯৫৬ সালে, তাঁর স্ত্রী বিশ্বের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী সিরিমাভো বন্দরনায়েক ১৯৬০ ও ৭০-এর দশকে এবং পরবর্তীতে তাঁদের কন্যা চন্দ্রিকা বন্দরনায়েক কুমারাতুঙ্গাও দেশটির রাষ্ট্রপতি হিসেবে ১৯৯০ ও ২০০০-এর দশকে জাতিসংঘের মঞ্চে ভাষণ দিয়ে ইতিহাস গড়েন।
যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে বুশ পরিবারের পিতা জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশ এবং পুত্র জর্জ ডব্লিউ বুশ উভয়েই প্রেসিডেন্ট হিসেবে সাধারণ পরিষদে নিয়মিত বক্তব্য দিয়েছেন। পাকিস্তানের রাজনীতিতে জুলফিকার আলী ভুট্টো এবং তাঁর কন্যা বেনজীর ভুট্টো নিজ নিজ সময়ে রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান হিসেবে বক্তব্য রাখেন। ইন্দোনেশিয়ায় স্বাধীন রাষ্ট্রনায়ক আহমদ সুকর্ন এবং তাঁর কন্যা মেঘবতী সুকর্নপুত্রি সাধারণ পরিষদে নিজ প্রতিনিধিত্ব করেছেন। এর বাইরেও মধ্যপ্রাচ্যের জর্ডানের হাশেমি রাজপরিবার, কাতারের আল থানি পরিবার, কিংবা আফ্রিকার গ্যাবন ও টোগোর শীর্ষ রাজনৈতিক পরিবারগুলোতেও এমন প্রজন্মভিত্তিক প্রতিনিধিত্বের ইতিহাস রয়েছে।
কিন্তু এসব আন্তর্জাতিক নজিরের সাথে বাংলাদেশের জিয়া পরিবারের অর্জনকে পাশাপাশি রাখলে একটি মৌলিক ও ঐতিহাসিক পার্থক্যের জায়গা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। উল্লেখিত পরিবারগুলোর ক্ষেত্রে কখনো পিতা-কন্যা, কখনো পিতা-পুত্র, কিংবা কখনো স্বামী-স্ত্রী ও কন্যার সমন্বয়ে প্রতিনিধিত্ব দেখা গেলেও, পৃথিবীর কোনো দেশেই একই পরিবারের পিতা, মাতা এবং সরাসরি তাঁদের সন্তান—তিনজনই নিজ নিজ সময়ে রাষ্ট্রের শীর্ষ আসনে আসীন হয়ে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে বক্তব্য দেওয়ার ঘটনা ঘটেনি। এই বিরল ও সর্বজনীন সমীকরণটি কেবল বাংলাদেশের জিয়া পরিবারের ক্ষেত্রেই সত্য হয়ে উঠেছে। কোনো রাজতন্ত্র, সামরিক একনায়কতন্ত্র কিংবা কৃত্রিম রাজনৈতিক ব্যবস্থার আশ্রয় ছাড়া, সম্পূর্ণ গণতান্ত্রিক জনমত, জনসমর্থন এবং জনগণের অভূতপূর্ব ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে একই পরিবারের পিতা (রাষ্ট্রপতি), মাতা (প্রধানমন্ত্রী) এবং সন্তান (সরকারপ্রধান)—তিনজনই রাষ্ট্রীয় শীর্ষ পদে থেকে স্বাধীন দেশের হয়ে বিশ্বমঞ্চে কথা বলার এই একক ইতিহাস জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার পর এই প্রথম।
পরিশেষে বলতে চাই,জিয়া পরিবারের এই ধারাবাহিক ও আকাশচুম্বী সাফল্যের মূল চালিকাশক্তি হলো বাংলাদেশের কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ে তাঁদের শিকড়প্রোথিত ভালোবাসার দৃঢ় অবস্থান এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অর্জিত গভীর আস্থা ও গ্রহণযোগ্যতা। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান তলাবিহীন ঝুড়ির অপবাদ মুছে বাংলাদেশকে একটি আত্মনির্ভরশীল ও আত্মমর্যাদাপূর্ণ রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্ব দরবারে দাঁড় করানোর যে কালজয়ী দর্শন রেখে গিয়েছেন, বেগম খালেদা জিয়া সেই ধারাকে আপন ত্যাগে ও যোগ্যতায় এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছেন। আর আজ দেশনায়ক তারেক রহমান সেই সমৃদ্ধ উত্তরাধিকারকে ধারণ করে আধুনিক, যুগোপযোগী ও নতুন বিশ্বের নিত্যনতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার সক্ষমতায় রূপান্তরিত করছেন। বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে বাংলাদেশের নাম উচ্চারিত হলে জিয়া পরিবারের এই ঐতিহাসিক ও বিরল গৌরবগাথা স্বতঃস্ফূর্তভাবে উঠে আসতে বাধ্য। আন্তর্জাতিক কূটনীতির সর্বোচ্চ অঙ্গনে দেশনায়ক তারেক রহমানের এই ঐতিহাসিক ভাষণ প্রদান ও আগমনী বার্তা কেবল একটি পরিবারের অনন্য কিংবা ব্যক্তিগত অর্জনের গল্প নয়; বরং এটি সমগ্র বাংলাদেশ, দেশের ষোলো কোটি সাধারণ মানুষ এবং বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা কোটি কোটি বাংলাভাষীর জন্য এক অসীম গর্ব ও পরম আনন্দের বিষয়। এই বিরল ও নজিরবিহীন রেকর্ড পুরো বাংলাদেশকে বিশ্বমঞ্চে এক নতুন মর্যাদা, আত্মসম্মান ও অনন্য গৌরবের আসনে চিরস্থায়ীভাবে অধিষ্ঠিত করল। জাতি হিসেবে এটা আমাদের জন্য নিঃসন্দেহে আনন্দ ও গর্বের সবচেয়ে বড় অনুষঙ্গ। মহান আল্লাহ সুবহানাতায়ালা আমাদের সহায় হোন।