জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ অধিবেশনে যোগ দিতে সোমবার নিউইয়র্কে পৌঁছানোর কথা রয়েছে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের। আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সাধারণ বিতর্কে ভাষণ দেওয়ার কথা রয়েছে তার।
সফরে সরকারের অগ্রাধিকার, সংস্কার কার্যক্রম, বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণ এবং ‘নতুন বাংলাদেশ’-এর পরিকল্পনা বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে বাবা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী মরহুমা খালেদা জিয়ার ধারাবাহিকতায় জাতিসংঘের বিশ্বমঞ্চে বক্তব্য দিতে যাচ্ছেন তারেক রহমান।
প্রধানমন্ত্রীর সফর ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের মধ্যেও ব্যাপক প্রস্তুতি চলছে। নিউইয়র্কের জন এফ কেনেডি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রধানমন্ত্রী ও তার সফরসঙ্গীদের স্বাগত জানাতে প্রস্তুতি নিচ্ছেন দলটির নেতাকর্মীরা।
কর্মব্যস্ত সময় কাটাবেন প্রধানমন্ত্রী
জানা গেছে, সোমবার নিউইয়র্ক পৌঁছানোর পর কর্মব্যস্ত সময় কাটাবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সফরকালে তিনি গ্র্যান্ড হায়াত হোটেলে অবস্থান করবেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, যুক্তরাষ্ট্র সফরের শুরুতে জাতিসংঘের মহাসচিব এন্তোনিও গুতেরেসের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে মিলিত হওয়ার কথা রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর। বৈঠকে আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের অবদান, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থায় উন্নয়নশীল দেশগুলোর কার্যকর অংশীদারত্ব নিয়ে আলোচনা প্রাধান্য পেতে পারে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তৃতীয় প্রজন্ম হিসেবে জাতিসংঘের অধিবেশনে ভাষণ দিতে যুক্তরাষ্ট্র আসছেন, এটি আমাদের জন্য গর্বের বিষয়। আমরা তাকে স্বাগত জানাতে প্রস্তুত।
এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশের সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানদের সঙ্গে সাইডলাইন বৈঠকের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। এসব বৈঠকে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ, দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ও কৌশলগত সহযোগিতার বিষয় গুরুত্ব পেতে পারে।
এসডিজি অগ্রগতি পর্যালোচনা, ডিজিটাল উদ্ভাবন ও বৈশ্বিক খাদ্য নিরাপত্তা বিষয়ক একাধিক উচ্চপর্যায়ের সাইড ইভেন্টেও প্রধানমন্ত্রীর অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে।
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণ এবং নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার নিশ্চিত করার বিষয়ে সরকারের অঙ্গীকার তুলে ধরবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানা গেছে, ২৪ সেপ্টেম্বরের ভাষণে সরকারের অগ্রাধিকার, সংস্কার কার্যক্রম এবং ‘নতুন বাংলাদেশ’ নিয়ে সরকারের লক্ষ্য ও পরিকল্পনা তুলে ধরবেন তিনি।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারবিষয়ক চুক্তির (আইসিসিপিআর) সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নাগরিকদের নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার নিশ্চিত করতে সরকারের নেওয়া পদক্ষেপগুলোও তুলে ধরতে পারেন প্রধানমন্ত্রী। বাংলাদেশ ২০০০ সালে এ চুক্তিতে স্বাক্ষর করে।
বাবা-মায়ের ধারাবাহিকতায় তারেক রহমান
বাবা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী মরহুমা খালেদা জিয়ার পর এবার একই পরিবারের তৃতীয় রাজনীতিক হিসেবে জাতিসংঘের বিশ্বমঞ্চে বক্তব্য দিতে যাচ্ছেন তারেক রহমান।
১৯৮০ সালের আগস্টে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ১১তম বিশেষ অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। ওই বিশেষ অধিবেশনে বাংলাদেশের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরে বক্তব্য দেন।
ওই বক্তব্যে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও উন্নয়নশীল বিশ্বের বিভিন্ন সংকটের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় ছোট ও উন্নয়নশীল রাষ্ট্রগুলোর স্বার্থ, মর্যাদা ও নিরাপত্তার বিষয় তুলে ধরেন তিনি। উন্নয়নশীল ও স্বল্পোন্নত দেশগুলোর অর্থনৈতিক মুক্তি, খাদ্য নিরাপত্তা, বৈশ্বিক বৈষম্য দূর করা, বিশ্বশান্তি ও আঞ্চলিক সহযোগিতার ওপরও গুরুত্ব দেন।
এরপর মরহুমা খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে ২০০৫ সালে জাতিসংঘের বিভিন্ন উচ্চপর্যায়ের আয়োজনে বাংলাদেশের পক্ষে বক্তব্য দেন। ওই বছর জাতিসংঘের বিশ্ব সম্মেলনের ওয়ার্ল্ড সামিটসহ একাধিক আয়োজনে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে বক্তব্য রাখেন তিনি।
বাবা ও মায়ের ধারাবাহিকতায় এবার জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে বক্তব্য দিতে যাচ্ছেন তারেক রহমান। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রূপান্তর, অর্থনৈতিক নীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অগ্রাধিকার বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরার ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর এই সফরকে তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখছেন কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা।
বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য মোহাম্মদ মিজানুর রহমান ভুঁইয়া মিল্টন বলেন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে জাতিসংঘে বাংলায় বক্তব্য রেখে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের ভূ-রাজনীতি ও অবস্থান শক্তভাবে তুলে ধরেছিলেন। খালেদা জিয়া প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে একাধিকবার জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে অংশগ্রহণ করেন এবং বাংলাদেশের উন্নয়ন, গণতন্ত্র ও সার্বজনীন অধিকার নিয়ে বিশ্বের দরবারে বক্তব্য উপস্থাপন করেন।
এবার ৮১তম সাধারণ অধিবেশনে বাবা ও মায়ের রাজনৈতিক উত্তরসূরি হিসেবে বিশ্বমঞ্চে বক্তব্য রাখবেন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। এ ভাষণকে ঘিরে দেশি-বিদেশি রাজনৈতিক মহলে ইতোমধ্যেই তৈরি হয়েছে প্রবল আগ্রহ।
প্রধানমন্ত্রী ও দলীয় প্রধানের যুক্তরাষ্ট্র সফর ঘিরে ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা। এ নিয়ে দফায় দফায় বৈঠক করছেন তারা।
দলটির নির্বাহী কমিটির সদস্য গিয়াস আহমেদ বলেন, আমরা সব নেতাকর্মীরা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে স্বাগত জানাতে প্রস্তুত। ইনশাআল্লাহ সোমবার জন এফ কেনেডি বিমানবন্দরে তাকে স্বাগত জানাতে নেতাকর্মীদের ঢল নামবে।
বোস্টন বিএনপির সভাপতি বদরা সাইদ বলেন, দীর্ঘদিন পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের যুক্তরাষ্ট্র সফর ঘিরে প্রবাসীদের মাঝে উদ্দীপনা সৃষ্টি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র বিএনপি নেত্রী কর্মীরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন।
যুবদলের কেন্দ্রীয় সহসভাপতি আবু সাঈদ আহমেদ বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফর ঘিরে নিউইয়র্কে উৎসবের আমেজ বিরাজ করছে। ইতোমধ্যে বিভিন্ন স্থানে পোস্টার-ব্যানার লাগানো হয়েছে।
নিউইয়র্ক দক্ষিণ মহানগর বিএনপির সভাপতি সেলিম রেজা বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তৃতীয় প্রজন্ম হিসেবে জাতিসংঘের অধিবেশনে ভাষণ দিতে যুক্তরাষ্ট্র আসছেন, এটি আমাদের জন্য গর্বের বিষয়। আমরা তাকে স্বাগত জানাতে প্রস্তুত।
জাতীয়তাবাদী যুবদলের সাবেক তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক তোফায়েল লিটন চৌধুরী বলেন, এ কথা অনস্বীকার্য যে, প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের যুক্তরাষ্ট্র সফর স্মরণীয় হয়ে থাকবে। তাকে স্বাগত জানাতে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন স্টেট বিএনপির নেতাকর্মীরা ইতোমধ্যে নিউইয়র্কে চলে এসেছেন।
৮১তম সাধারণ অধিবেশন ও উচ্চপর্যায়ের সপ্তাহ
জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ অধিবেশনের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হয়েছে ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬। উচ্চপর্যায়ের সপ্তাহ শুরু হবে ২২ সেপ্টেম্বর। সাধারণ পরিষদের সাধারণ বিতর্ক ২২ থেকে ২৬ সেপ্টেম্বর এবং ২৮ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত হবে।
এবারের অধিবেশনের মূল প্রতিপাদ্য—‘রিস্টোরিং ট্রাস্ট, ম্যানেজিং ট্রান্সফরমেশন : আ ইউনাইটেড নেশনস দ্যাট ডেলিভার্স ফর অল’—অর্থাৎ ‘আস্থা পুনরুদ্ধার, রূপান্তর ব্যবস্থাপনা: সবার জন্য কার্যকর একটি জাতিসংঘ’।
৮১তম সাধারণ অধিবেশনের অংশ হিসেবে স্থানীয় সময় ১৮ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের হলে অনুষ্ঠিত হয়েছে ‘এসডিজি মোমেন্ট’। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের রেজোলিউশন ৭৪/৪ অনুযায়ী মহাসচিব এ আয়োজন করেন। এবারের প্রতিপাদ্য ছিল—‘একসঙ্গে, আমরা পারব’।
জাতিসংঘের সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট গোলস রিপোর্ট ২০২৬ অনুযায়ী, তথ্য পাওয়া ১৩৯টি লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে ৩৬ শতাংশ সঠিক পথে রয়েছে অথবা মধ্যম অগ্রগতি অর্জন করেছে। তবে অর্থায়নের ঘাটতি, জলবায়ুর অভিঘাত, ঋণের চাপ, সংঘাত ও বৈষম্যের কারণে অগ্রগতি এখনো ধীর ও অসম।
এসডিজি মোমেন্টে সরকার, নাগরিক সমাজ, বেসরকারি খাত, তরুণ প্রজন্ম ও জাতিসংঘ ব্যবস্থার বিভিন্ন অংশীদাররা ঋণসংকট, ক্রমবর্ধমান বৈষম্য এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সুযোগ ও চ্যালেঞ্জসহ বিভিন্ন কাঠামোগত বাধা মোকাবিলার উপায় নিয়ে আলোচনা করেন।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, এসডিজি মোমেন্টের চারটি প্রধান অংশ ছিল—উদ্বোধনী, সংলাপ, করণীয় নির্ধারণ ও সমাপনী পর্ব। উদ্বোধনী পর্বে জাতিসংঘ মহাসচিব ও সাধারণ পরিষদের সভাপতি বক্তব্য দেন। সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, বেসরকারি খাত, শিক্ষাবিদ, বিশেষজ্ঞ, তরুণ প্রজন্ম ও অন্যান্য অংশীজনও এতে অংশ নেন।