যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোতে সরকারের চাপ ও তদারকি বাড়ার মধ্যেই দেশটির অনেক খ্যাতনামা অধ্যাপক ও গবেষককে কানাডার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে টেনে নেওয়া হচ্ছে। বৃহস্পতিবার কানাডার শিল্পমন্ত্রী মেলানি জোলি ৬৪ জন বিশ্বমানের শিক্ষাবিদ ও গবেষককে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগ দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন।
কানাডা সরকার আগামী আট বছরে এসব গবেষকের জন্য ৫০ কোটি কানাডিয়ান ডলারের বেশি অর্থ সহায়তা দেবে। তাঁদের মধ্যে ৪৮ জনই আসছেন যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়, কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয় ও ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি থেকে।
নতুন গবেষকেরা চিকিৎসাবিজ্ঞান, প্রকৌশল, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও জলবায়ু বিজ্ঞানের মতো গুরুত্বপূর্ণ ও উদীয়মান ক্ষেত্রে গবেষণা করবেন।
ট্রাম্প প্রশাসনের সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ওপর সরকারি নজরদারি ও রাজনৈতিক চাপ বাড়ার অভিযোগ উঠেছে। সরকারের নীতির সঙ্গে প্রতিষ্ঠানগুলোর অবস্থান না মিললে কেন্দ্রীয় অর্থায়ন ও গবেষণা অনুদান বন্ধের হুমকি ও পদক্ষেপের ঘটনাও সামনে এসেছে। এতে মার্কিন একাডেমিক অঙ্গনে গবেষণার স্বাধীনতা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
কানাডার ভ্যাঙ্কুভারে ইউনিভার্সিটি অব ব্রিটিশ কলাম্বিয়া আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে মেলানি জোলি বলেন, কিছু দেশ যখন গবেষণার বাজেট কমাচ্ছে এবং একাডেমিক স্বাধীনতা থেকে সরে যাচ্ছে, তখন কানাডা বিজ্ঞানে আরও বেশি বিনিয়োগ করছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যিক বা রাজনৈতিক টানাপোড়েনের বিষয়টি সামনে রেখে কানাডার এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে কি না, এমন প্রশ্নে জোলি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র তাদের সিদ্ধান্ত নিচ্ছে এবং কানাডা নিজেদের সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। কানাডায় এসব অধ্যাপক ও গবেষক যোগ দিচ্ছেন বলে তিনি সন্তোষ প্রকাশ করেন।
গবেষকদের আকৃষ্ট করতে কানাডা ‘গ্লোবাল ইমপ্যাক্ট+ রিসার্চ ট্যালেন্ট ইনিশিয়েটিভ’ নামে একটি কর্মসূচি চালু করেছে। এ কর্মসূচির আওতায় দেশটি বিশ্বমানের গবেষকদের জন্য মোট ১৭০ কোটি কানাডিয়ান ডলারের বিশেষ তহবিল গঠন করেছে।
কানাডার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় এরই মধ্যে নতুন গবেষকদের স্বাগত জানিয়েছে। ইউনিভার্সিটি অব ব্রিটিশ কলাম্বিয়া ৯ জন এবং টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয় ৬ জন মার্কিন গবেষককে তাদের অনুষদে যুক্ত করেছে।
ইউবিসির প্রেসিডেন্ট ও ভাইস চ্যান্সেলর ড. বেনোয়া-আঁতোয়ান বেকন বলেন, এসব গবেষকের গবেষণা মানবকল্যাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেসিডেন্ট মেলানি উডিনও কানাডার এই সরকারি সহায়তাকে কৌশলগত ও গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
যুক্তরাষ্ট্র ছেড়ে আসা গবেষকদের কয়েকজন নিজেদের সিদ্ধান্তের পেছনে দেশটির বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও একাডেমিক স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগের কথা বলেছেন।
ম্যাসাচুসেটস বিশ্ববিদ্যালয়ের আরএনএ বায়োলজি গবেষক ফিলিপ জামোর বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান পরিবেশে তিনি নিজের সেরা গবেষণা চালিয়ে যেতে পারছেন না। বিশ্বসেরা তরুণ গবেষকদের দলে নেওয়া এবং তাঁদের নিরাপদ পরিবেশে কাজের নিশ্চয়তা দেওয়াও কঠিন হয়ে পড়েছে বলে জানান তিনি।
ম্যাসাচুসেটস বিশ্ববিদ্যালয় আমহার্স্ট থেকে কানাডার ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেওয়া ডিজিটাল মিডিয়া বিশেষজ্ঞ ইথান জাকারম্যানও গবেষণা ও মুক্ত চিন্তার পরিবেশের গুরুত্ব তুলে ধরেছেন। তাঁর মতে, গণতন্ত্র ও মুক্ত চিন্তার ওপর চাপ বাড়ার সময়ে এমন গবেষণাকে সমর্থন করা গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের একাডেমিক অঙ্গনে নীতিগত কড়াকড়ি ও অনিশ্চয়তার কারণে যে মেধাপাচারের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, কানাডা সেটিকে নিজেদের গবেষণা খাত শক্তিশালী করার সুযোগ হিসেবে কাজে লাগাচ্ছে। এর ফলে উচ্চশিক্ষা, গবেষণা ও উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে কানাডার অবস্থান আরও শক্ত হতে পারে।
সূত্র: বিবিসি, সিএনএন