Jahirul Hasan
প্রকাশ : Sep 22, 2026 ইং
অনলাইন সংস্করণ

ইউরোপের দুর্বলতা জেনে গেছে হুতি

ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীরা লোহিত সাগরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও কৌশলগত জলপথ বাবে আল-মান্দেবে অবস্থান জোরদার করার মাধ্যমে বিশ্ব অর্থনীতির মূল সংবেদনশীল জায়গায় চরম আঘাত হেনেছে। পরিস্থিতি এতটাই জটিল রূপ নিয়েছে যে, সম্প্রতি জ্যাকেটের ভেতর থেকে হাত বের করে ইয়েমেনে লড়াইরত সৌদি আরবের জন্য রাজকীয় বিমানবাহিনীর (আরএএফ) আকাশেই জ্বালানি ভরতে সক্ষম বিমান পাঠাতে বাধ্য হচ্ছে যুক্তরাজ্য। যদিও একটি মাত্র অতিরিক্ত যুদ্ধবিমান মধ্যপ্রাচ্যের এই ভারসাম্য রাতারাতি বদলে দেবে না, কারণ সৌদি আরবের কাছে ইতোমধ্যেই বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী বিমানবহর রয়েছে, যার মধ্যে এফ-ফিফটিন এবং ইউরোফাইটার টাইফুনও আছে। যদিও তাদের বহরে ব্রিটেনের কাছে থাকা স্টিলথ এফ-থার্টিফাইভ নেই, তবুও ব্রিটেনের এই সাহায্য মূলত হোয়াইট হাউসের প্রতি একটি স্পষ্ট বার্তা। লন্ডন বিশ্বমঞ্চকে মনে করিয়ে দিতে চায় যে, বাবে আল-মান্দাব প্রণালিজুড়ে হুতিদের এই আগ্রাসনকে আর অবহেলা করার সুযোগ নেই।

ইরানের সাথে টানা সাত মাসের যুদ্ধের পর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় হয়তো কিছুটা ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। এমনকি সম্প্রতি ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন একটি আস্ত দেশকে উড়িয়ে দেওয়ার কিংবা ধূলিসাৎ করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন, সেটিও পত্রিকার ভেতরের পাতায় ছোট করে স্থান পেয়েছে। অথচ এই হুতি বিশ্ব অর্থনীতিকে এক লহমায় অচল করে দিতে পারে এবং এমন এক আঞ্চলিক অস্থিরতার জন্ম দিতে পারে যার প্রভাব বহু বছর ধরে বিশ্বকে বইতে হবে। এই সংকটের পেছনে ট্রাম্পের আকস্মিক কঠোর অবস্থান বা তার নিজস্ব ভীতি কাজ করছে কি না, তা নিয়ে ইতিমধ্যেই প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।

মে মাসে সোমালিল্যান্ডের উপকূল থেকে শুরু করে লোহিত সাগর, সুয়েজ খাল এবং আকাবা বা ইলাত উপসাগরের এই বিশাল বাণিজ্যিক রুট এখন সরাসরি হুতি হুমকির মুখে। এডেন উপসাগরকে যুক্ত করা এই সরু জলপথ দিয়ে তেল, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস এবং কোটি কোটি টাকার অন্যান্য পণ্য নিয়ে প্রতিনিয়ত জাহাজ যাতায়াত করে। পশ্চিমের দিকে এই পথ দিয়ে উপসাগরীয় দেশগুলোর অপরিশোধিত তেল পৌঁছে যায় ইউরোপীয় বাজারে, আর পূর্বের দিকে সৌদি আরবের ইয়ানবু বন্দর থেকে জ্বালানিবাহী ট্যাঙ্কারগুলো যাত্রা করে সুদূর প্রাচ্যের উদ্দেশ্যে। বিশ্ব বাণিজ্যের প্রায় এক-দশমাংশ এবং কনটেইনার ট্রাফিকের এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হয় এই জলপথ দিয়ে। কিন্তু হুতিদের সাম্প্রতিক আক্রমণের পর এখানে বাণিজ্যিক জাহাজের চলাচল ২০২৩ সালের তুলনায় প্রায় ৬০ শতাংশ কমে গেছে। বিকল্প পথ হিসেবে আফ্রিকার 'কেপ অব গুড হোপ' ঘুরে জাহাজ পাঠাতে গিয়ে অতিরিক্ত তিন হাজার নটিক্যাল মাইল অতিক্রম করতে হচ্ছে, যা প্রতিটি যাত্রায় অন্তত ১০ দিন করে বাড়তি সময় যোগ করছে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অচলাবস্থার মধ্যে যুক্তরাজ্যের এই পদক্ষেপের পেছনে এটিও একটি বড় কারণ।

এই আগ্রাসনের মূল ইন্ধনটি আসছে সরাসরি তেহরান থেকে। ইসরায়েলকে ঘিরে ফেলে এক ধ্বংসাত্মক ছায়াযুদ্ধের নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার লক্ষ্যেই দীর্ঘ দিন ধরে ইরান এই রিং অব ফায়ার তৈরি করে এসেছে। একসময় এই প্রক্সি নেটওয়ার্কের কেন্দ্রবিন্দু ছিল লেবাননের হিজবুল্লাহ, যার সামরিক শক্তি ইসরায়েলের পেজার বিস্ফোরণ, টার্গেটেড হত্যাকাণ্ড এবং স্থল অভিযানের কারণে চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একই অবস্থা হয়েছে হামাস এবং প্যালেস্টাইন ইসলামিক জিহাদেরও; তারা এখনও হুমকি হলেও পূর্বের সেই অবস্থানে নেই। তবে বর্তমানে এই অক্ষের সবচেয়ে বড় আঞ্চলিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে হুথিরা। কালাশনিকভ আর টয়োটা পিকআপ নিয়ে লড়াইয়ে নামা প্রায় সাড়ে তিন লাখ পদাতিক সৈন্যের পাশাপাশি তাদের কাছে রয়েছে ইরানের দেওয়া ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র, দূরপাল্লার ড্রোন, জাহাজ-বিধ্বংসী অস্ত্র এবং অত্যাধুনিক মাইন। এছাড়া ইরাকের ইসলামিক রেজিস্ট্যান্স বা পিএমএফ-এর মতো বিভিন্ন অনুগত মিলিশিয়া গোষ্ঠীও তেহরানের নির্দেশে কাজ করে চলেছে।

সম্প্রতি ইরাকের মায়সান প্রদেশ থেকে আসা এক রহস্যময় ড্রোন হামলায় সৌদি আরবের ঐতিহাসিক ৭৪৫ মাইল দীর্ঘ ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনটি ধ্বংস হয়ে যায়। যা হরমুজ প্রণালিকে এড়িয়ে তেল পরিবহনের প্রধান মাধ্যম ছিল। এই ঘটনার পর বিশ্ববাজারে তেলের দাম হু হু করে বেড়ে গেছে। যদিও পিএমএফ এই হামলার দায় অস্বীকার করেছে, তবে ঘটনার পেছনের সুতা যে তেহরানের দিকেই গেছে তা নিয়ে সন্দেহ কম। এই আক্রমণটি বাব আল-মান্দেব উপকূলে হুতিদের তাণ্ডবের সাথেই সরাসরি সম্পর্কিত। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অধীনে এক শতাব্দী ধরে থাকা ঐতিহাসিক পেরিম দ্বীপটি এখন পুরোপুরি হুথিদের দখলে, যা এই পুরো প্রনালীতে তাদেরকে কৌশলগত সুবিধা এনে দিয়েছে। এর পাশাপাশি ইয়ানবু, বাইশ এবং ফারাসানে সৌদি নাগরিকদের লক্ষ্য করে হামলা চালাচ্ছে হুথিরা, এমনকি রিয়াদ লক্ষ্য করেও ছোঁড়া হয়েছে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র। ফলে সৌদি তেলের রপ্তানি অভূতপূর্ব সর্বনিম্নে ঠেকেছে এবং তারা শত শত কোটি ডলারের রাজস্ব হারাচ্ছে।

যুদ্ধের দীর্ঘসূত্রতার কারণে ইসরায়েল এবং পশ্চিমা দেশগুলোর মতোই সৌদি আরবেরও মিসাইল ইন্টারসেপ্টর বা ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধ ব্যবস্থার তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে তারা চীন এবং ওমানের মধ্যস্থতায় হুতিদের সাথে যুদ্ধবিরতির চেষ্টা করছে, যা কার্যত অঞ্চলের সবচেয়ে ধনাঢ্য ও প্রভাবশালী দেশের জন্য একপ্রকার নতি স্বীকারের সামিল। কারণ রিয়াদ এখন ৭ অক্টোবরের মতো কোনো আকস্মিক বড় ধরণের বিপর্যয়ের আশঙ্কায় তটস্থ হয়ে আছে।

ইরান যুদ্ধের সার্বিক প্রেক্ষাপটে তেহরানের কৌশল এখন পরিষ্কার। হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল এমনিতেই বাধাগ্রস্ত, তাই এখন তারা দ্বিতীয় কৌশলগত জলপথ বাবে আল-মান্দাবকে অচল করে দেওয়ার চেষ্টা করছে। তাদের মূল উদ্দেশ্য পাশ্চাত্যের পকেটে টান মারা এবং তাদের এমন এক দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধের ফাঁদে ফেলা, যা অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে তাদের নিঃশেষ করে দেবে। এর ফলে প্রচণ্ড চাপে পড়েছেন সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান। তিনি বার বার তার মিত্রদের মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে এটি কেবল সৌদির সমস্যা নয়, এই জলপথ বন্ধ হলে পুরো বিশ্বের অর্থনীতি ধসে পড়বে। কিন্তু চরম মুহূর্তে তাঁর গঠিত মুসলিম ন্যাটো কোনো কাজেই আসেনি; পাকিস্তান পূর্বের সংঘাতের অজুহাত দেখিয়ে পিছিয়ে গেছে এবং তুরস্কও সাহায্যের আবেদনে সাড়া দেয়নি। এমনকি মিশর, যাদের অর্থনৈতিক আয়ের অন্যতম উৎস সুয়েজ খালের আয় এই সংকটে থমকে গেছে, তারাও কোনো সামরিক ভূমিকা নিতে রাজি হয়নি।

রিয়াদ থেকে হোয়াইট হাউসে বারবার ফোন আসা সত্ত্বেও ডোনাল্ড ট্রাম্প এখন পর্যন্ত সরাসরি কোনো মার্কিন সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি কেবল সেন্টকম কমান্ডার অ্যাডমিরাল ব্রাড কুপারকে পাঠিয়েছেন এবং প্রায় ২০০ সামরিক উপদেষ্টা সম্বলিত একটি যৌথ কমান্ড সেন্টার স্থাপন করেছেন যা কেবল রিয়েল-টাইম তথ্য এবং কৌশলগত পরামর্শ প্রদানে সীমাবদ্ধ। শেষ উপায় হিসেবে ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান আমেরিকার মাধ্যমে জেরুজালেমের সাহায্যও চেয়েছেন। ইসরায়েল সরাসরি অভিযানে অংশ না নিলেও হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র উড্ডয়নের খবর এবং গোয়েন্দা তথ্য দিয়ে রিয়াদকে সহায়তা করতে সম্মত হয়েছে।

সূত্র: টেলিগ্রাফ

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

‘মেসির চেয়েও ভালো ফুটবল খেলছে ইয়ামাল’

1

ফুলহামে অভিষেকের পর ৫ম স্তরের ক্লাবে ফারহান

2

ডামুড্যায় নানা বাড়িতে বেড়াতে এসে পানিতে পড়ে শিশুর মৃত্যু

3

বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডকে হারানোর দিন ঘিরে বড় সিদ্ধান্ত আর্জেন্ট

4

এসআই আলতাফ হত্যায় জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তারের নির্দেশ স্বরাষ্ট

5

একযোগে ১০ ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়লো উত্তর কোরিয়া

6

প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা উপদেষ্টার সঙ্গে কানাডার হাইকমিশনার

7

রিয়াদে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর অবকাশ থেকে আগেভাগেই ফিরলেন ট্র

8

ট্রান্সগার্ড গ্রুপের হেড অব অনবোর্ডিংয়ের সঙ্গে কনসাল জেনারে

9

নিসচা খুলনা মহানগরের সাংগঠনিক সম্পাদক হলেন ফাতেমা-তুজ-জোহরা

10

সংঘর্ষে তেলবাহী জাহাজের ইঞ্জিন রুমে পানি, অক্ষত ৩৩ হাজার টন

11

কারিগরি ও ক্রীড়া শিক্ষায় সহযোগিতার আগ্রহ অস্ট্রেলিয়ার

12

আইন পেশায় মানবিকতাকে গুরুত্ব দিতে হবে : আইনমন্ত্রী

13

ইউরোপেই থাকছেন সালাহ

14

ভেদরগঞ্জে গাঁজাসহ এক মাদক ব্যবসায়ী আটক

15

বাঁশখালীতে প্রধানমন্ত্রী, সমুদ্রপাড়ে জনসমুদ্র

16

ডিসেম্বরের মধ্যেই জুলাই সনদের আলোচনা শেষ করে সংসদে রিপোর্ট প

17

বন্ধুত্বকে সম্মান জানাতে ধোনির সঙ্গে অবসরের ভাবনায় রায়না

18

শুটিং করতে গিয়ে নেপালে আটকা পড়লেন খরাজ

19

ইরানের বিরুদ্ধে ‘অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট’ ঘোষণা যুক্তরাষ্ট

20