Jahirul Hasan
প্রকাশ : Aug 30, 2026 ইং
অনলাইন সংস্করণ

অটোরিকশার দাপটে অচল সড়ক,গুদের ওপর বিষফোরা হয়ে দাঁড়িয়েছে

এস.এ.এম সুমন সাংবাদিক ও কলামিস্ট 

শহরের অলিগলি থেকে রাজপথ, সড়ক থেকে মহাসড়ক দেশের প্রায় সর্বত্রই এখন চোখে পড়ে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার দাপট। স্বল্প খরচে যাতায়াতের অন্যতম মাধ্যম হিসেবে সাধারণ মানুষের কাছে এসব যান জনপ্রিয় হলেও অনিয়ন্ত্রিত ও বেপরোয়া চলাচল, অতিরিক্ত সংখ্যা, সড়ক দখল, যানজট এবং দুর্ঘটনার কারণে অটোরিকশা এখন জনজীবনের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন শহর ও উপজেলা পর্যায়ে প্রধান সড়ক, আঞ্চলিক মহাসড়ক এমনকি গুরুত্বপূর্ণ সড়কেও অনেক সময় এসব যান চলাচল করতে দেখা যায়। কোথাও উল্টো পথে, কোথাও হঠাৎ রাস্তার মাঝখানে থেমে যাত্রী ওঠানামা, আবার কোথাও অতিরিক্ত গতি ও প্রতিযোগিতামূলকভাবে চলাচলের কারণে তৈরি হচ্ছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি। সাম্প্রতিক বিভিন্ন প্রতিবেদনে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার অনিয়ন্ত্রিত চলাচলকে যানজট ও দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হিসেবে উঠে এসেছে।

প্রতিদিনই বাড়ছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি

অটোরিকশার সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সড়কে দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বাড়ছে  সাধারণ মানুষের।  চালকের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ নেই, নেই যথাযথ দক্ষতা বা সড়ক আইন সম্পর্কে প্রয়োজনীয় জ্ঞান। ফলে ব্যস্ত সড়কে হঠাৎ লেন পরিবর্তন, ভুল পথে চলাচল, যেখানে-সেখানে দাঁড়িয়ে যাত্রী ওঠানো এবং দ্রুতগতিতে চলার প্রবণতা প্রায়ই দেখা যায়।

এর ফলে অটোরিকশার সঙ্গে অন্যান্য যানবাহনের সংঘর্ষের পাশাপাশি যাত্রী ও পথচারীরাও দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছেন। দুর্ঘটনায় কেউ প্রাণ হারাচ্ছেন, কেউ গুরুতর আহত হয়ে দীর্ঘদিন চিকিৎসাধীন থাকছেন, আবার কেউ স্থায়ীভাবে কর্মক্ষমতা হারাচ্ছেন। অথচ এসব দুর্ঘটনার একটি বড় অংশ স্থানীয় পর্যায়ে যথাযথভাবে নথিভুক্ত না হওয়ায় সামগ্রিক ক্ষতির পূর্ণ চিত্রও অনেক সময় সামনে আসে না।

দেশের সামগ্রিক সড়ক দুর্ঘটনা পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক। সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের ওয়েবসাইটে ২০২৬ সালের বিভিন্ন মাসের সড়ক দুর্ঘটনার প্রতিবেদন নিয়মিত প্রকাশ করা হচ্ছে।

যানজটের আরেক নাম অটোরিকশা?

অতিরিক্ত অটোরিকশা শুধু দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে না, অনেক এলাকায় সৃষ্টি করছে তীব্র যানজট। নির্দিষ্ট স্ট্যান্ড না থাকায় সড়কের পাশে কিংবা মোড়ের ওপর দাঁড়িয়ে যাত্রী তোলা, ফুটপাত ও রাস্তার অংশ দখল করে রাখা এবং যেখানে-সেখানে পার্কিংয়ের কারণে স্বাভাবিক যান চলাচল বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

কুমিল্লা শহরের উদাহরণও এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য। সেখানে ২০২৬ সালের জুলাই মাসে সিটি করপোরেশন জানিয়েছিল, নগরীতে বিপুল সংখ্যক ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চলাচল করছে এবং নিবন্ধনের মাধ্যমে সংখ্যা সীমিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা অতিরিক্ত অটোরিকশাকে যানজট ও দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

ফুটপাত দখল, রাস্তার ওপর অটোরিকশার সারি

শুধু সড়ক নয়, অনেক এলাকায় অটোরিকশার স্ট্যান্ড ও পার্কিংয়ের কারণে ফুটপাতও দখল হয়ে যাচ্ছে। এতে পথচারীরা বাধ্য হয়ে মূল সড়কে হাঁটছেন। ফলে একদিকে যানবাহনের চাপ বাড়ছে, অন্যদিকে পথচারীদের দুর্ঘটনার ঝুঁকিও তৈরি হচ্ছে।

অটোরিকশা মালিক ও চালকদের একটি অংশ জীবিকার তাগিদে এ পেশায় যুক্ত হলেও পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনার অভাবে একটি বড় জনগোষ্ঠীর চলাচল ও নিরাপত্তা বিঘ্নিত হচ্ছে। তাই সমস্যাটিকে শুধু চালকদের বিরুদ্ধে অভিযান হিসেবে না দেখে একটি সমন্বিত পরিবহন ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে দেখা প্রয়োজন।

অবৈধ চার্জিংয়ে বিদ্যুৎ অপচয়ের অভিযোগ

ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার আরেকটি বড় সমস্যা হলো অনিয়ন্ত্রিত চার্জিং ব্যবস্থা। বিভিন্ন এলাকায় অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ ব্যবহার করে অটোরিকশা চার্জ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে রাজধানীর তেজগাঁও ও মতিঝিল,  হাতিরঝিল, মোহাম্মদপুর, মিরপুর  এলাকায় যৌথ অভিযানে অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন, সরঞ্জাম জব্দ এবং অটোরিকশা আটক করার ঘটনাও ঘটেছে।

এরপরও বিভিন্ন স্থানে গোপনে অবৈধ চার্জিং চলার অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। ফলে একদিকে বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ, অন্যদিকে বিদ্যুৎ চুরি ও অগ্নিঝুঁকির মতো সমস্যাও তৈরি হচ্ছে।

লাইসেন্স ও প্রশিক্ষণ নিয়ে প্রশ্ন

সড়কে চলাচলকারী প্রতিটি চালকের দক্ষতা, প্রশিক্ষণ ও বৈধ লাইসেন্স নিশ্চিত করা জরুরি। কিন্তু ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার ক্ষেত্রে নিবন্ধন, চালকের লাইসেন্স, যানবাহনের ফিটনেস, কারিগরি মান এবং কোন সড়কে এসব যান চলবে এসব বিষয়ে দীর্ঘদিন ধরেই নিয়ন্ত্রণ ও নীতিমালা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) মোটরযানের নিবন্ধন, ফিটনেস এবং মোটরযান চালকের লাইসেন্স প্রদানের দায়িত্ব পালন করে। সড়ক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে চালকের প্রশিক্ষণ ও বৈধ লাইসেন্স নিশ্চিত করা তাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তাহলে সমাধান কোথায়?

অটোরিকশা পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া সহজ বা বাস্তবসম্মত সমাধান নয়। কারণ দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষ স্বল্প খরচে যাতায়াতের জন্য এসব যান ব্যবহার করেন এবং বিপুলসংখ্যক মানুষের জীবিকাও এর সঙ্গে জড়িত। প্রয়োজন হলো অনিয়ন্ত্রিত অটোরিকশা চলাচল বন্ধ করে নিয়ন্ত্রিত ও নিরাপদ ব্যবস্থা গড়ে তোলা।

এ জন্য কয়েকটি বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। 

প্রথমত, প্রতিটি অটোরিকশার নিবন্ধন ও নির্দিষ্ট পরিচিতি নিশ্চিত করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, চালকদের জন্য বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণ ও বৈধ লাইসেন্সের ব্যবস্থা করতে হবে।

তৃতীয়ত, অটোরিকশার সংখ্যা নির্ধারণ করে প্রয়োজন অনুযায়ী অনুমোদন দিতে হবে।

চতুর্থত, জাতীয় ও গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়ক এবং নির্দিষ্ট প্রধান সড়কে এসব যান চলাচলের বিষয়ে স্পষ্ট বিধিনিষেধ থাকতে হবে।

পঞ্চমত, নির্ধারিত স্ট্যান্ড ছাড়া যত্রতত্র পার্কিং ও যাত্রী ওঠানামা বন্ধ করতে হবে।

ষষ্ঠত, অনুমোদিত ও নিরাপদ চার্জিং স্টেশন স্থাপন করতে হবে এবং অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান চালাতে হবে।

সপ্তমত, অটোরিকশার ব্রেক, লাইট, টায়ার, ব্যাটারি, স্টিয়ারিংসহ গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশের নিরাপত্তা পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করতে হবে।

অষ্টমত, শুধু অভিযান চালিয়ে কিছুদিন বন্ধ রাখার পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি নজরদারি ও আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।

জনগণ ও প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি

অটোরিকশা আজ দেশের পরিবহন ব্যবস্থার বাস্তবতার একটি অংশ। তাই সমস্যার সমাধান করতে হলে চালক, মালিক, যাত্রী, পথচারী, সিটি করপোরেশন, স্থানীয় প্রশাসন, ট্রাফিক পুলিশ, বিদ্যুৎ বিভাগ এবং সংশ্লিষ্ট পরিবহন কর্তৃপক্ষ সব পক্ষকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।

প্রশাসনের দায়িত্ব হবে আইন ও নীতিমালা কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা। আর চালক ও মালিকদের দায়িত্ব হবে আইন মেনে যান পরিচালনা করা। একই সঙ্গে যাত্রীদেরও যেখানে-সেখানে গাড়ি থামিয়ে ওঠানামা না করে নির্ধারিত স্থান ব্যবহারে সচেতন হতে হবে।

এখনই লাগাম টানতে হবে

অটোরিকশা যদি পরিকল্পিত ও নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থার মধ্যে আনা না যায়, তাহলে ভবিষ্যতে যানজট, সড়ক দুর্ঘটনা, জনদুর্ভোগ ও অবৈধ বিদ্যুৎ ব্যবহারের সমস্যা আরও বাড়তে পারে। এর প্রভাব পড়বে মানুষের জীবন ও জীবিকার ওপর, ক্ষতিগ্রস্ত হবে নগর ব্যবস্থাপনা এবং বাধাগ্রস্ত হবে স্বাভাবিক সড়ক যোগাযোগ।

তাই অটোরিকশার বিরুদ্ধে শুধু অভিযান নয় প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট নীতিমালা, নিবন্ধন, চালকের প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্স, যানবাহনের ফিটনেস পরীক্ষা, নির্দিষ্ট রুট ও স্ট্যান্ড এবং কঠোর আইন প্রয়োগ।

জনগণের নিরাপদ চলাচলের অধিকার নিশ্চিত করতে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। কারণ সড়ক কারও ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয় সড়ক সবার, আর নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও সমাজের সম্মিলিত দায়িত্ব।

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

হাওর অঞ্চলের মানুষের গল্পে রুনা খান

1

ইউক্রেনে ট্যাকটিক্যাল পারমাণবিক বোমা ছুড়তে পারে রাশিয়া

2

বান কি মুনের পর সিরিয়ায় জাতিসংঘের মহাসচিব

3

মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের নির্বাহী কমিটিতে এমপি ফজলুর রহ

4

সেপ্টেম্বরে মুখোমুখি হচ্ছে ভারত-আফগানিস্তান, অনিশ্চিত বাংলাদ

5

৫৪ রানে অলআউটের পরও নিজেদের ওপর বিশ্বাস ছিল : মিরাজ

6

ইংলিশ চ্যানেলে নৌকায় আগুন, ১৭৩ অভিবাসী উদ্ধার

7

বাংলাদেশের সার্বিক সংস্কার প্রক্রিয়ায় সহযোগিতা করতে চায় ইউএন

8

শুটিংয়ের ব্যস্ততার মাঝেও বন্যাদুর্গতদের পাশে সালমান খান

9

চার্চের বাইরে হাজার হাজার ভক্ত, রোনালদো-জর্জিনা কি বিয়ে করেছ

10

মাথাপিছু অস্ত্র রপ্তানিতে যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়াকে ছাড়িয়ে অনেক

11

আর্সেনালের পরিবর্তে ম্যানসিটিতে যোগদানের কারণ জানালেন মঙ্গা

12

সালাহকে পেতে তুর্কি ক্লাবের অবিশ্বাস্য প্রস্তাব

13

অনার্স পর্যন্ত নারীদের ফ্রিতে পড়াশোনার ব্যবস্থা করা হবে : প্

14

মধ্যপ্রাচ্যের পরাশক্তি হওয়ার সক্ষমতা ইসরায়েলের নেই

15

‘এ বিষয়ে আমি কিছু জানি না, ব্যাপারটি আমার নলেজে নেই’

16

কাতারের প্রতি যে আহ্বান জানাল ইরান

17

সৌদিকে উত্তেজনা না বাড়াতে কড়া হুঁশিয়ারি হুতিদের

18

ফিফার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ করবে নরওয়ে

19

বিবাহবিচ্ছেদের আবেদন প্রত্যাহার, থালাপতি বিজয়ের জন্য স্বস্তি

20