
তাইওয়ান শান্তি চায়, তবে স্বাধীনতা বিসর্জন দেবে না বলে জানিয়েছেন দ্বীপটির প্রেসিডেন্ট লাই চিং-তে। শনিবার তাইওয়ানের জাতীয় দিবস উপলক্ষে দেওয়া ভাষণে তিনি বলেন, তাইওয়ানের মানুষের অস্তিত্বের অধিকারকে সম্মান করতে হবে। একই সঙ্গে তিনি বলেন, প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানো কোনো উসকানি নয়।
লাইয়ের বক্তব্যের পরপরই এর নিন্দা জানিয়েছে চীন। বেইজিংয়ের দাবি, লাই সত্যকে বিকৃত করেছেন এবং তার বক্তব্যের পেছনে ‘অসৎ উদ্দেশ্য’ রয়েছে।
গণতান্ত্রিকভাবে পরিচালিত তাইওয়ানকে নিজেদের ভূখণ্ড বলে দাবি করে চীন। দ্বীপটির সরকার এ দাবি প্রত্যাখ্যান করে আসছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তাইওয়ানের ওপর সামরিক ও রাজনৈতিক চাপ বাড়িয়েছে বেইজিং।
চীনের তুলনায় সামরিক শক্তিতে অনেক পিছিয়ে থাকা তাইওয়ান এখন প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় বাড়াচ্ছে এবং সশস্ত্র বাহিনীকে আধুনিক করছে। চীনও অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান, বিমানবাহী রণতরি ও বিপুলসংখ্যক ক্ষেপণাস্ত্রসহ সামরিক সক্ষমতা বাড়াচ্ছে।
জাতীয় দিবসের অনুষ্ঠানে লাই বলেন, শুধু শান্তির প্রত্যাশা দিয়ে শান্তি নিশ্চিত করা যায় না। তাইওয়ান শান্তি চায় এবং বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগেও আগ্রহী। তবে অন্যের অধীনতা মেনে নেবে না।
তিনি বলেন, কর্তৃত্ববাদী শক্তির বিস্তারের মুখে তাইওয়ানের অবস্থান শুধু নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার বিষয় নয়। এর সঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের একটি মৌলিক নীতিও জড়িত—শক্তি প্রয়োগ করে নিয়মের ওপর প্রাধান্য বিস্তার করা যায় না এবং কোনো জনগোষ্ঠীর নিজের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকার কেড়ে নেওয়া যায় না।
চীনের তাইওয়ানবিষয়ক দপ্তর এক বিবৃতিতে লাইয়ের বক্তব্যকে ‘তথ্য উপেক্ষা, সত্য বিকৃতি ও জনগণকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা’ বলে উল্লেখ করেছে। দপ্তরটির দাবি, লাই ‘তাইওয়ানের স্বাধীনতা’ প্রতিষ্ঠার বিচ্ছিন্নতাবাদী অবস্থানে অনড় রয়েছেন এবং মূল ভূখণ্ড থেকে আসা হুমকিকে অতিরঞ্জিত করছেন।
চীনের বক্তব্য, বিশ্বে একটিই চীন রয়েছে এবং তাইওয়ান তার অংশ। তাইওয়ানের ভবিষ্যৎ চীনের সব মানুষের, যার মধ্যে তাইওয়ানের বাসিন্দারাও রয়েছেন, সম্মিলিতভাবে নির্ধারণ করা উচিত বলেও দাবি করেছে বেইজিং।
তাইওয়ানকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিতে প্রয়োজনে সামরিক শক্তি ব্যবহারের পথ খোলা রেখেছে চীন। দেশটি লাইকে ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী’ বলে আখ্যা দেয় এবং তার আলোচনার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে আসছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের এক জ্যেষ্ঠ প্রশাসনিক কর্মকর্তা বলেছেন, তাইওয়ান প্রণালিতে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার বিষয়ে লাইয়ের অঙ্গীকারকে স্বাগত জানায় ওয়াশিংটন। চীনের প্রতি ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, নিয়মিত একটি ভাষণকে আগ্রাসী বা জবরদস্তিমূলক পদক্ষেপের অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয়।
আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক না থাকলেও যুক্তরাষ্ট্র তাইওয়ানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক সমর্থক। দ্বীপটির প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াতেও ওয়াশিংটন সহযোগিতা করে আসছে।
ভাষণে লাই বলেন, তার সরকারের প্রতিরক্ষা খাতে বাড়তি বিনিয়োগের লক্ষ্য যুদ্ধ উসকে দেওয়া নয়, বরং যুদ্ধ ঠেকানো। তিনি বলেন, সংলাপের পথ বন্ধ করতে নয়, বরং সমতা ও মর্যাদার ভিত্তিতে আলোচনা নিশ্চিত করতেই তাইওয়ান নিজেদের প্রতিরক্ষা শক্তিশালী করছে।
তিনি আরও বলেন, ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের গণতান্ত্রিক দেশগুলোর উচিত একসঙ্গে কাজ করে আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখা।
যুক্তরাষ্ট্রের নতুন অস্ত্র প্যাকেজের অপেক্ষা
২০২৪ সালে লাই প্রেসিডেন্ট হিসেবে প্রথম জাতীয় দিবসের ভাষণ দেওয়ার পর চীন তাইওয়ানের চারপাশে সামরিক মহড়া চালিয়েছিল। গত বছর এমন মহড়া না হলেও চলতি বছরের ডিসেম্বরের শেষ দিকে তাইওয়ানের কাছে সর্বশেষ সামরিক মহড়া চালায় বেইজিং। এর আগে তাইপের জন্য ১১ বিলিয়ন ডলারের মার্কিন অস্ত্র চুক্তির খবর প্রকাশিত হয়েছিল, যা ছিল এ ধরনের সবচেয়ে বড় চুক্তি।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এখনো তাইওয়ানের জন্য প্রস্তাবিত দ্বিতীয় অস্ত্র প্যাকেজ অনুমোদন করেননি। এর সম্ভাব্য মূল্য ১৪ বিলিয়ন ডলার।
লাই বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও চীন সংলাপের মাধ্যমে নিজেদের প্রতিযোগিতা সামাল দেবে এবং সংঘাতের ঝুঁকি কমাবে—এমন উদ্যোগকে তিনি স্বাগত জানান। গত মাসে ওয়াশিংটনে দুই দেশের শীর্ষ বৈঠকের প্রসঙ্গেই তিনি এ কথা বলেছেন বলে জানিয়েছেন এক তাইওয়ানি কর্মকর্তা।
তাইওয়ানের জাতীয় দিবস ১৯১১ সালের সেই অভ্যুত্থানের বার্ষিকীতে পালিত হয়, যার মাধ্যমে চীনের শেষ রাজবংশের পতন ঘটে এবং চীন প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়।
১৯৪৯ সালে মাও সেতুংয়ের নেতৃত্বাধীন কমিউনিস্টদের কাছে গৃহযুদ্ধে পরাজিত হওয়ার পর চীনের প্রজাতান্ত্রিক সরকার তাইওয়ানে আশ্রয় নেয়। দ্বীপটির আনুষ্ঠানিক নাম এখনো চীন প্রজাতন্ত্র।
সূত্র: রয়টার্স